জামায়াত প্রার্থী করছে সাদিক কায়েমকে, এনসিপির আসিফ মাহমুদ কী করবেন
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে জামায়াতে ইসলামী মেয়র পদে সাদিক কায়েমকে চূড়ান্ত করেছে। এর আগে এনসিপি জোটসঙ্গী হিসেবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নাম ঘোষণা করে রাখায় সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে এনসিপির ভেতর ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মেয়র পদে জামায়াতে ইসলামী ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার বিষয়টি মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছে। তবে এর আগেই ওই সিটিতে এনসিপি তাদের প্রার্থী হিসেবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছিল।
এনসিপিতে আসিফ মাহমুদ এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দায়িত্বে আছেন এবং দলের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করছেন। এই অবস্থার পর জামায়াতের পক্ষ থেকে সাদিক কায়েমকে চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে জামায়াত–এনসিপির সমঝোতা না হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, আবার কারও মতে দুই দলই নিজেদের মতো করে প্রার্থী ঠিক করছে। শেষ পর্যন্ত ফল কী হবে, সে বিষয়ে আরও সময়ের অপেক্ষার কথা বলা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি জোট বেঁধে অংশ নেয়। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচন কবে হবে—তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও বছরের শেষ দিকে শুরু করার পরিকল্পনার উল্লেখ আছে। এনসিপির সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আপাতত দলের মনোযোগ একক প্রস্তুতিতে। তফসিল ঘোষণার বিষয়টি পরিষ্কার না থাকায় নির্বাচনী জোট বা সমঝোতা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিভিন্ন দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সাদিক কায়েমকে জামায়াতের প্রার্থী করার বিষয়টি এনসিপির আসিফ মাহমুদের সমর্থকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে বলেও বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের সম্মুখভাগে ছিলেন আসিফ মাহমুদ। অন্তর্বর্তী সরকারে স্থান পাওয়া তিন ছাত্র উপদেষ্টার মধ্যে তিনি একজন। নির্বাচন করার উদ্দেশ্যে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সরকার থেকে পদত্যাগ করে এনসিপিতে যোগ দেন এবং দলের মুখপাত্র হন।
এনসিপির এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনে আসিফ মাহমুদকে সমর্থন দিতে জামায়াতের আপত্তি ছিল। সেই সময় উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের কারণে সমর্থন সম্ভব নয়—এ ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। পরে আসিফ মাহমুদ আর নির্বাচনে অংশ নেননি। একই ধরনের বিষয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ঘটছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
এছাড়া এনসিপির এক রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্যের ভাষ্য হিসেবে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনের সময় জামায়াতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে আসিফ মাহমুদের ভূমিকা নেতিবাচক ছিল—এ কারণে তাঁর প্রতি জামায়াতের তীব্র আপত্তি আছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সেই বিষয়গুলো কী—তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
এদিকে এনসিপি এখন পর্যন্ত এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলীয়ভাবে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ পাঁচ সিটির মেয়র পদে এবং ১০০ উপজেলা–পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। গত ২৯ মার্চ মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়, সেখানে ঢাকা দক্ষিণে দলটির প্রার্থী হিসেবে আসিফ মাহমুদের নাম আসে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে অন্যান্য দলের মতো এনসিপির নেতারাও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অন্যদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করছেন—এমন তথ্যও আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। স্থানীয়ভাবে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ থেকে এই আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ১১–দলীয় ঐক্যে মামুনুল হকের সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়েছে এবং ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর একাধিক বৈঠকে তাঁর উপস্থিতির তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।
জোট–সমঝোতা বিষয়ে এনসিপির আলোচনায় এমন সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে যে, যদি ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সাপোর্ট দেয় দক্ষিণ সিটিতে আসিফ মাহমুদকে, আর উত্তর সিটিতে ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপি সমর্থন দেয়—তাহলে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, এ ধরনের কোনো আলোচনা এখনো হয়নি। আবার এনসিপি যদি জামায়াত জোট থেকেই নির্বাচন করে, তাহলে ঢাকার দুই সিটির একটি এবং কুমিল্লা (আসিফ মাহমুদের বাড়ি) অথবা ঢাকার আশপাশের কোনো একটি সিটিতে সমর্থন চাইতে পারে—এ ধরনের কথাও উল্লেখ আছে।
এ বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে জাতীয়ভাবে যদি মনে হয়, সরকারি দলের বাইরে বিভিন্ন সিটিতে বিরোধী প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে—তখন শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যেক দল সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী করার দিকেই মনোযোগী বলেও বলা হয়েছে।
সাদিক কায়েম প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের অনেক প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে ভোট চেয়েছিলেন। গত ২২ জুন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। এরপর ১৩ জুলাই ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদককের দায়িত্ব ছাড়েন—নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে সূত্র উল্লেখ করেছে।
সাদিক কায়েমকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করার পর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ জামায়াতের সমর্থন পাচ্ছেন না—এ অবস্থায় কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করবেন কি না, করলে কীভাবে করবেন—এ বিষয়ে স্পষ্টতা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
প্রতিবেদনে আরও এসেছে, সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো বোঝাপড়া হবে—সেটি রাজনৈতিক জোট না হয়ে নির্বাচনী সমঝোতাও হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জামায়াত জোটের বাইরে সমঝোতা হতে পারে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব ধরনের সম্ভাবনাই আসলে আছে।’ তিনি আরও বলেন, মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো এবং অন্য নেতাদের সঙ্গেও তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রক্রিয়া হলে তা দলীয় উদ্যোগে হবে বলে তিনি জানান। তবে তফসিল ঘোষণার সময় আসতে আসতে এসব বিষয় স্পষ্ট হবে বলেও বলা হয়।
এ ছাড়া আসিফ মাহমুদের বক্তব্য হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জোট থেকে ৩০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ৬টিতে জিতেছে এনসিপি। তাঁর মতে, ৩০টি আসনে নির্বাচন করা এবং ২৭০টি আসনে নির্বাচন না করার কারণে এনসিপির তৃণমূল অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব জায়গাতেই যাতে এককভাবে অংশ নেওয়া যায়, অথবা কোনো ধরনের বোঝাপড়া হলে অন্তত ৭০ শতাংশ জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান।


