সাইবার জগতে বটবাহিনীর নীরব যুদ্ধ: ভুয়া অ্যাকাউন্টের ঝুঁকি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও স্বয়ংক্রিয় ‘বটবাহিনী’ বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরে জনমত, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত প্রচারণা, অপপ্রচার, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারনির্ভর ‘বটবাহিনী’ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নেটওয়ার্ক পরিকল্পিতভাবে জনমত প্রভাবিত করা, অপপ্রচার চালানো, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর কাজে ব্যবহার হতে পারে। ফলে গণতন্ত্র, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের বিস্তার ঘটার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান এবং জনমত গঠনের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে সংঘবদ্ধভাবে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, ভুয়া জনমত সৃষ্টি ও সমন্বিত অপপ্রচার বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাঁর মতে, অনলাইনের প্রকৃত ব্যবহারকারী ও কৃত্রিম কার্যকলাপকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ না করলে জনমত বা সাইবার বুলিংয়ের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, ‘বট’ এমন এক ধরনের সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট, মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া দিতে পারে। বিপুলসংখ্যক বট বা ভুয়া অ্যাকাউন্টকে একযোগে পরিচালনা করা হলে সাধারণভাবে তা ‘বটবাহিনী’ হিসেবে পরিচিত। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক ইস্যু ঘিরে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বটবাহিনী সাধারণত দুইভাবে কাজ করে—এক ধরনের বট সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুসারে চলে। অন্য ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব মানুষ একাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। সমন্বিত এই কার্যক্রমকে অনেকে ‘ট্রল আর্মি’ নামেও উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, বটবাহিনী তিনটি কৌশলে সক্রিয় হতে পারে। প্রথমত, কোনো ঘটনা ঘটার পর দ্রুত বিপুলসংখ্যক মন্তব্যের মাধ্যমে জনমতের ধারা প্রভাবিত করার চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমন্বিত অপপ্রচার চালিয়ে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট কোনো পেজ বা অ্যাকাউন্টকে বিপুলসংখ্যক রিপোর্টের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অস্বাভাবিক সংখ্যক মন্তব্য আসা, একই ধরনের ভাষায় অসংখ্য মন্তব্য দেখা যাওয়া বা ভুয়া পরিচয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে একযোগে সক্রিয়তা—এসব বট কার্যক্রমের সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে, বটবাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জনমত গঠনের ওপর। একই ধরনের অসংখ্য মন্তব্য দেখে অনেক ব্যবহারকারী সেটিকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত মনে করতে পারেন। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বলা হয়। রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটিকে ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ নামে চিহ্নিত করা হয়—যেখানে কৃত্রিমভাবে স্বতঃস্ফূর্ত জনমতের পরিবেশ তৈরি করা হয়।
এছাড়া ডিপফেক ভিডিও, বিভ্রান্তিকর ছবি এবং ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বট নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলা ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করতে হবে।
তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা সম্প্রসারণ জরুরি। সচেতন ব্যবহারকারী তৈরি হলে বটনির্ভর অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।


