বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · সত্য • সাহস • সংবাদ📍 আপনার এলাকা: রাজশাহী
রাজশাহী নিউজ
সর্বশেষরাজশাহী ও বাংলাদেশের সর্বশেষ সংবাদ জানতে সঙ্গে থাকুন

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা: জুলাই-আগস্ট পরবর্তী হয়রানি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও নাশকতার মামলাসহ নানা হয়রানির অভিযোগ বেড়েছে। মানবাধিকার ও অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী অনেক সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা, গ্রেপ্তার ও চাকরিহারার মধ্যেও পড়েছেন।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও নাশকতার মামলা এবং অন্যান্য ধরনের হয়রানির অভিযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, অনুসন্ধানী সংস্থা ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় জীবন ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া অনেক সাংবাদিক এখন মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে বা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সাংবাদিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনদের অভিযোগ, কঠোর নজরদারি, হুমকি এবং সহিংসতার মধ্যেও যারা ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তাঁদের একটি অংশকে ‘বিচারাধীন আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত কয়েকশ সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের মামলায় জড়িয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, এ সময়ে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮৫ জন সরাসরি হামলার শিকার, ১৭৪ জন হত্যা মামলার আসামি, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি এবং ৩৭ জন নাশকতা মামলার আসামি। একই সময়ে নিহত হয়েছেন ৬ জন সাংবাদিক। এমএসএফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি ৬২২ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, গত ১৭ মাসে ৪২৭টি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮৩৪ জন সাংবাদিক। এদের মধ্যে ৩৭৯ জন আহত এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ১৮৯ জন চাকরি হারিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক নেতারা বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিকল্পিতভাবে এই স্তম্ভকে আঘাত করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে; ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের পরিবারও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘স্বৈরাচারের দোসর’ নামে বাংলাদেশের আইনে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ নেই এবং এই তকমা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিবারের অজ্ঞাতে বা দূর সম্পর্কের সূত্র ধরে সাংবাদিকদের আসামি করা হয়। কুড়িগ্রামে এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিককে আসামি করার অভিযোগ ওঠার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ লালমনিরহাট ও রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায়ও পাওয়া যায়। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও জানেন না কীভাবে মামলা দায়ের হয়েছে কিংবা কেন সাংবাদিকদের নাম যুক্ত করা হয়েছে। সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও দি ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানিয়েছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলা হওয়া ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- হত্যা মামলাগুলো পর্যালোচনা করা হবে এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে। একই তথ্য তুলে ধরে সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং এসব মামলা পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী আগে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ে হয়রানি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ আছে। বিভিন্ন জেলায় দেখা গেছে, হত্যা ও নাশকতার মামলায় আসামি হয়ে বহু সাংবাদিক আত্মগোপনে আছেন এবং কেউ কেউ চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কিছু সাংবাদিকের বক্তব্য, ঘটনার সময় তাঁরা ঘটনাস্থলেই ছিলেন না; তবুও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে তাঁদের মামলায় জড়ানো হয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের এই মামলা ও হয়রানির ঘটনাগুলো নিয়ে দেশজুড়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।