সরকারি নিয়োগে প্রশাসনের সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১১ প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক শীর্ষ নিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—রাষ্ট্রের লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগের সমন্বয় এবং যোগ্যতা-ভিত্তিক জবাবদিহিই সাফল্যের শর্ত।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে সাহসী ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আছে। ১৯৮০ সালের ৩০ এপ্রিল সাভারের জিরাবো গ্রামে প্রথম ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠনের মধ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করার একটি নতুন ধারণা শুরু করা হয়। এ প্রসঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হলে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতেই হয়।
প্রায় ৪৬ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনায় আরেকটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে অনেকে মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সম্প্রতি ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব নিয়োগে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও, প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে—এই সিদ্ধান্তকে কেবল রাজনৈতিক নিয়োগ হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও সম্ভাবনা পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
দেশে বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব অনেক। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদকে প্রশাসনের কাছে গুরুত্বহীন বা ‘ডাম্পিং পোস্ট’ হিসেবে বিবেচনার অভিযোগ আছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রত্যাশিত উদ্যম নিয়ে কাজ না করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তাদের প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এ ধরনের উদাহরণ হিসেবে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যদি যথাযথ পরিকল্পনা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে পরিচালিত হয়, তাহলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে ভূমিকা রাখা সম্ভব। কিন্তু বছরের পর বছর অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে সরকারের পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় ও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন মূল্যায়নও এসেছে। তবে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস্তবিক অর্থে ঘুরে দাঁড় করাতে সক্ষম হন, তাহলে উদ্যোগের সুফল অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য শুধু মন্ত্রিসভা পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের কার্যকর সমন্বয়ও দরকার। একটি দেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সচিব, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা—সবাই সরকারের বৃহত্তর প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ; সরকারের নীতি ও কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাদের ওপরই বর্তায়।
উদাহরণ হিসেবে কৃষক কার্ড সরকারের একটি অগ্রাধিকার কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বলা হয়—সাফল্য মাঠ প্রশাসনের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করবে। প্রকৃত কৃষকদের সঠিক তালিকা তৈরি, সুবিধাভোগী নির্বাচন স্বচ্ছ রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে বিচার বিভাগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা—সবকিছুই সফল বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের নীতি ও কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করে। তবে সেখানে রাজনৈতিক আনুগত্যের পাশাপাশি দক্ষতা, সততা, যোগ্যতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্বশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রশাসন বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কেবল দলীয়করণের হাতিয়ার না বানিয়ে যোগ্য ও কর্মক্ষম নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
এছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি জনগণের কাছে। জনগণ ভোট দিয়ে একটি দলকে ক্ষমতায় পাঠায় এবং নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়—সুতরাং সরকারের সাফল্য নির্ভর করে প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়ন করা গেল তার ওপর। সেই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকর, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করার কথাও বলা হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে—এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে এবং মাঠ প্রশাসনেও রদবদল হয়েছে। তবে সমর্থকদের একটি অংশ মনে করছে, এসব পরিবর্তন এখনও পর্যাপ্ত নয়। তাদের অভিযোগের ধরন হিসেবে বলা হয়েছে—প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এমন কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কথা, যারা অতীতে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলেন না বা দলটির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।
প্রতিবেদনটি বলছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা, সততা, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক দায়িত্ববোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, কারণ নীতিমালা ও প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষেরই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল হয়—প্রধান বিচারপতি থেকে নিম্ন আদালতের বিচারক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা এবং পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও পরিবর্তন আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সময়ের বিভিন্ন নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ ও বিতর্কের প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে আছে। বিশেষ করে প্রশাসনে পদায়ন, জেলা প্রশাসক নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের কথা বলা হলেও বলা হয়—অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী না করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা দরকার। আইন ও বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ, নিম্ন আদালতে আইনজীবী নিয়োগ এবং বিচার প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এ ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া নতুন নির্বাচিত সরকারের পক্ষে কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
প্রতিবেদনটি উপসংহারে বলছে, একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার প্রশাসনিক কাঠামো হুবহু রেখে নির্বাচিত সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সবসময় সহজ নয়। তবে পরিবর্তনের নামে নির্বিচারে দলীয়করণকেও সমাধান হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। প্রয়োজন এমন প্রশাসন, যেখানে যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সরকারের নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা—দুইটিই নিশ্চিত থাকবে।
এ প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ১১টি প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগকে রাষ্ট্রযন্ত্র নতুন করে সাজানোর বৃহত্তর সংস্কারের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা যায় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে উদ্যোগের কার্যকারিতা এবং সরকার রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও কী ধরনের সংস্কার করে—সেটি দেখার বিষয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাহসী সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সঠিক বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার যদি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে পারে, তাহলে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথও সহজ হবে।


